বিজয় দিবস রচনা Class 8 এর জন্য

বিজয় দিবস রচনা Class 8 এর জন্য
বিজয় দিবস রচনা Class 8 এর জন্য

ভূমিকা

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন এবং পরম আনন্দের দিন। এটি বাঙালির এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার দিন, শৃঙ্খল মুক্তির দিন এবং স্বাধীন অস্তিত্ব প্রকাশের দিন। এই ঐতিহাসিক দিনে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। দীর্ঘ নয় মাস অনেক রক্তের পিচ্ছিল পথ মাড়িয়ে, ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময় এবং অসংখ্য মা-বোনের সম্ভ্রমের মূল্যে বাঙালি জাতি সেদিন অর্জন করে তাদের প্রিয় স্বাধীনতা। মুক্তিকামী মানুষের কাছে সে দিনটি ছিল পরম কাঙ্ক্ষিত। আজও বাঙালি জাতি যখনই তার আত্মপরিচয় ও অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে যায়, তখনই পরম শ্রদ্ধায় ফিরে যায় এই গৌরবময় দিনটির কাছে। তাই আমাদের জাতীয় জীবনে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস এর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অত্যন্ত সুগভীর।

বিজয় দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে অবিভক্ত ভারতবর্ষ ভেঙে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তৎকালীন অবৈজ্ঞানিক দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে আমাদের পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের একটি অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়, যার নাম দেওয়া হয় পূর্ব পাকিস্তান। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানের ভেতরে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ ও অধিকার পায়নি। খুব দ্রুতই বাঙালিরা বুঝতে পারে যে, ধর্মের দোহাই দিয়ে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগ দেওয়া তাদের জন্য একটি মস্ত বড় ভুল ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই পূর্ব বাংলাকে তাদের উপনিবেশ মনে করত এবং নিপুণ ছলে চরম শোষণ-বৈষম্য চালাতে শুরু করে।

পাকিস্তানি শাসকরা প্রথম আঘাত হানে বাঙালির মাতৃভাষার ওপর। তারা উর্দুকে সমগ্র পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে। এর প্রতিবাদে গর্জে ওঠে পূর্ব বাংলার ছাত্র-জনতা। তারা দাবি তোলে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”। এই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় তীব্র ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বের হওয়া মিছিলে পাকিস্তানি পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে শহিদ হন সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ আরও অনেকে। এই রক্তপাত বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে আরও বেগবান করে তোলে।

পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং ১৯৬৯ সালের এগারো দফার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলায় এক অভূতপূর্ব ও ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। এই তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরাচারী সামরিক শাসক আইয়ুব খানের পতন ঘটে। এরপর আরেকটি সামরিক আইনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন ইয়াহিয়া খান। পূর্ব বাংলার মানুষের তীব্র ও ধারাবাহিক আন্দোলনের চাপে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে বাঙালির অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।

নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব বাঙালিদের হাতে দেওয়ার কথা থাকলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায় এবং শুরু করে এক গভীর ষড়যন্ত্রের নীল নকশা। এর চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পায় ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের ভয়াল কালো রাতে। “অপারেশন সার্চলাইট” নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত ও নিরীহ বাঙালি জনতার ওপর ট্যাংক ও আধুনিক অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নারকীয় গণহত্যা চালায়। কিন্তু বাঙালি জাতি এই চরম বিপর্যয় মুখ বুজে সহ্য করেনি। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলার সর্বস্তরের মানুষ জল্লাদ বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস ধরে পাকিস্তানি সেনারা এদেশের মানুষের ওপর বর্বর নির্যাতন, লুটপাট ও গণহত্যা চালায়। অবশেষে ভারতের মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি জাতি চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং অর্জিত হয় একটি স্বাধীন মানচিত্র ও একটি লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা।

বিজয় দিবসের তাৎপর্য ও গুরুত্ব

কেবলমাত্র একটি যুদ্ধ জয়ের মধ্য দিয়ে একটি জাতি নতুন পতাকা বা ভূখণ্ড পেয়েছে বলেই বিজয় সম্পূর্ণ সার্থক হয়ে যায় না। জাতীয় জীবনে এই বিজয়ের গভীর ও সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য রয়েছে। স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল বলেই আজ দেশের মেধাবী সন্তানরা শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অসামান্য মেধার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হচ্ছে। বাঙালি জাতি আজ মুক্ত বাতাসে নিজের ভাষা চর্চা করতে পারছে এবং নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে স্বাধীনভাবে লালন-পালন ও বিশ্বমঞ্চে বিকাশ করতে পারছে। আজ সারা বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতি কোনো অপরিচিত নাম নয়। বরং বিশ্বকে সমৃদ্ধ ও উন্নত করার ক্ষেত্রে এদেশের মানুষের রয়েছে এক গৌরবময় ও সক্রিয় অবদান।

বাংলাদেশে বিজয় দিবস উদযাপন

বাঙালি জাতির এই আনন্দের ও গৌরবের দিনটি প্রতি বছর দেশজুড়ে অত্যন্ত মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়ে থাকে। ১৬ই ডিসেম্বর সকালে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সর্বস্তরের মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এই দিনে দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারসহ সকল বেসরকারি টিভি চ্যানেল এই দিনের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করে। সংবাদপত্রগুলোতে বিশেষ ক্রোড়পত্র ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এছাড়া বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতেও যথাযথ মর্যাদায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

বিজয় দিবস এবং আমাদের প্রত্যাশা

স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পার হলেও আমরা যেমন উন্নত ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, তা পুরোপুরি অর্জন করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে আমাদের রাজনৈতিক মুক্তি মিললেও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এখনো পুরোপুরি আসেনি। দেশের জনজীবনে এখনো শতভাগ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে দেশের একটি বিশাল সংখ্যক শিক্ষিত ও দক্ষ বেকারের কর্মসংস্থান এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। এর পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির বিস্তার ও অনিয়ম আমাদের দারুণভাবে ব্যথিত করে। তাই স্বাধীনতাকে সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থবহ করে তুলতে হলে আমাদের প্রয়োজন অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন এবং দেশের সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা।

বিজয় দিবস এবং আমাদের প্রাপ্তি

অনেক না পাওয়ার বেদনা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রাপ্তির খাতাটি কিন্তু ছোট নয়। স্বাধীন বাংলাদেশ আজ শিক্ষা খাতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। দেশের প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে এবং বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখছে। দেশের অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে, যার অন্যতম উদাহরণ পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল। দেশের গ্রামীণ জনপদে শতভাগ বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন হয়েছে এবং স্বাস্থ্য খাতের মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনে, বিশেষ করে ক্রিকেটে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে নিজেদের সুখ্যাতি প্রতিষ্ঠা করেছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পোশাক শিল্প, চামড়া ও হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানির পাশাপাশি বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও এক নতুন পরিচিতি লাভ করেছে।

উপসংহার

এক সাগর রক্ত এবং লক্ষ লক্ষ বীর শহিদদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই প্রিয় সোনার বাংলাদেশ। এই নতুন দেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধ এবং উন্নত সোনার দেশ হিসেবে গড়ে তোলার পবিত্র দায়িত্ব দেশের প্রতিটি নাগরিকের। বিজয় দিবস হলো স্বাধীনতাকামী ও দেশপ্রেমিক বাঙালির পবিত্র চেতনার মূল উৎস। বিজয়ের এই মহান চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের অগ্রযাত্রায় শামিল হতে হবে, তবেই শহিদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।